সারাদিন আমরা অসংখ্য কথা বলি। প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয়, জায়েয এবং নাজায়েয—সব ধরনের কথাবার্তায় আমাদের সময় কেটে যায়। কিন্তু সেই সময়ের সামান্য অংশও কি আল্লাহর যিকিরে ব্যয় হয়? নিজের দিকে তাকালে এই প্রশ্ন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। যবানের ব্যস্ততা থাকলেও হৃদয়ের ব্যস্ততা কি আল্লাহর স্মরণে থাকে?
দুনিয়াবী ব্যস্ততা ও আখেরাতের দায়িত্ব
দুনিয়াবী ব্যস্ততা জীবনজুড়েই থাকে। জীবিকা, সংসার ও দায়িত্ব পালনের জন্য এসব কাজ করতেই হয়। কিন্তু সবসময় কি দুনিয়াকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত? আখেরাতের দায়িত্ব কে নেবে? দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, অথচ আখেরাত চিরস্থায়ী। এই অল্প সময়ের দুনিয়ার জন্য যদি পুরো জীবন ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে আখেরাতের জন্য কী সঞ্চিত থাকবে?
আরও পড়ুন >> গোপনে দান কেন উত্তম? ইসলামে দানের ফজিলত ও লোক দেখানো দানের পরিণতি
যিকিরের মর্যাদা কুরআন ও হাদীসে
কুরআন ও হাদীসে আল্লাহর যিকিরের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর স্মরণই সবচেয়ে বড় আমল। আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, যারা বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করে—পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।
হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিকিরকে সর্বোত্তম আমল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এমনকি আল্লাহর পথে দান করা বা যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হওয়ার চেয়েও যিকিরকে অধিক মর্যাদাপূর্ণ বলা হয়েছে।
অগ্রগামী কারা?
এক হাদীসে এসেছে, “মুফাররিদরা অগ্রগামী হয়ে গেছে।” সাহাবারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করে—তারাই অগ্রগামী। এটি প্রমাণ করে, যিকির কেবল নফল ইবাদত নয়; বরং আত্মিক উন্নতির অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
অল্প সময়ের যিকির, বড় প্রতিদান
কিছু যিকির আছে, যা পড়তে খুব কম সময় লাগে, অথচ তার প্রতিদান অনেক বড়। যেমন, একটি নির্দিষ্ট তাসবীহ আছে, যা পড়তে সহজ, কিন্তু আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং আমলের পাল্লায় ভারী। দিনে একশবার এই তাসবীহ পড়লে ছোট গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়—যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতো হয়।
যবানের গুনাহ ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব
আমাদের অধিকাংশ গুনাহ যবানের মাধ্যমে হয়। অযথা কথা, কটু বাক্য, গীবত—সবই যবানকেন্দ্রিক। তাই যিকিরের পাশাপাশি ইস্তিগফার করা খুব জরুরি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও দিনে সত্তরের বেশি ইস্তিগফার করতেন। তাহলে আমাদের কত বেশি ইস্তিগফার প্রয়োজন, তা সহজেই অনুমেয়।
ঘুমের আগের তাসবীহের শিক্ষা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যাকে খাদেম দেওয়ার পরিবর্তে বিশেষ তাসবীহ শিক্ষা দিয়েছিলেন। ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট সংখ্যক তাসবীহ, তাহমীদ ও তাকবীর পড়তে বলা হয়। তিনি বলেছেন, এটি দুনিয়াবী সাহায্যের চেয়েও উত্তম।
দৈনন্দিন দুআর মাধ্যমে আল্লাহর স্মরণ
নবীজী আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজের জন্য দুআ শিখিয়েছেন। ঘুমানো, ওঠা, খাওয়া, দৈনন্দিন প্রয়োজন—সবক্ষেত্রেই দুআ রয়েছে। এর উদ্দেশ্য একটাই, যেন কোনো অবস্থাতেই আমরা আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না হই।
ব্যস্ততার অজুহাত কি গ্রহণযোগ্য?
আমরা প্রায়ই বলি, কাজের চাপে সময় পাই না। কিন্তু অতীতের মহীয়সী নারীদের জীবন দেখলে বোঝা যায়, তাঁদের ব্যস্ততা আমাদের চেয়েও বেশি ছিল। তবুও তাঁদের জীবন যিকির ও আমলে ভরপুর ছিল। কারণ, তাঁরা আখেরাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
যিকিরের সহজ পথ
আমরা কাজ করি হাত-পা দিয়ে। কিন্তু মুখ তো অবসরেই থাকে। তাই হাঁটতে-চলতে, কাজের ফাঁকে, এমনকি ব্যস্ত সময়েও যিকির করা সম্ভব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি মূলনীতি দিয়েছেন—যেন আমাদের যবান সবসময় আল্লাহর যিকিরে সিক্ত থাকে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, যিকিরকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানানো। আল্লাহ যেন আমাদের যবানকে সবসময় তাঁর স্মরণে সজীব রাখেন। দুনিয়া ও আখেরাত—উভয় জীবনে সফলতার চাবিকাঠি এখানেই।