শিশুরা সমাজের সবচেয়ে কোমল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের চরিত্র ও মানসিকতা যেমনভাবে গড়ে ওঠে, ভবিষ্যৎ সমাজও তেমনভাবে নির্মিত হয়। ইসলাম শিশুদের প্রতি দয়া, মমতা ও সম্মানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এই শিক্ষার সর্বোচ্চ আদর্শ হলেন মহানবী মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর পুরো জীবন শিশুদের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও মানবিক আচরণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেছেন, রাসুলুল্লাহর জীবনের মধ্যেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। শিশুদের ব্যাপারেও নবীজির আচরণ ছিল অনুকরণীয়। তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন, তাদের সম্মান করতেন এবং তাদের অনুভূতির প্রতি গভীর যত্ন নিতেন।
শিশুদের প্রতি নবীজির গভীর মমতা
নবীজি (সা.) শিশুদের কোলে নিতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন এবং তাদের জন্য দোয়া করতেন। শিশুরাও তাঁকে আপন মনে করত। তারা তাঁর কাঁধে ও পিঠে চড়ত। নবীজি এতে কখনো বিরক্ত হতেন না। বরং তিনি হাসিমুখে সবকিছু গ্রহণ করতেন।
একবার তিনি তাঁর নাতি হাসানকে চুমু দিলেন। এক সাহাবি বললেন, তিনি কখনো সন্তানদের চুমু খাননি। তখন নবীজি বললেন, যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়াও করা হয় না। এই হাদিস আমাদের শেখায়, শিশুদের আদর করা ঈমানি গুণ।
আরও পড়ুন >> বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান: ইসলামে সামাজিক ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা
দয়া ও ভালোবাসা ইসলামের মূল শিক্ষা
নবীজি স্পষ্টভাবে বলেছেন, যে ব্যক্তি ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে তাঁর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী। এর মাধ্যমে তিনি সমাজে ভারসাম্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
শুধু নিজের সন্তান নয়, ঘরের কাজের মানুষের সন্তান কিংবা এতিম শিশুর প্রতিও দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন নবীজি। তিনি কখনো শিশুদের গায়ে হাত তুলতেন না। এমনকি তাঁর খাদেম আনাস (রা.)-এর সাথেও তিনি সর্বদা নম্র আচরণ করেছেন।
শিশুদের সালাম ও সম্মান শেখানো
নবীজি নিজে শিশুদের আগে সালাম দিতেন। তিনি বুঝিয়েছেন, এতে শিশুদের আত্মসম্মান গড়ে ওঠে। বড়রা যদি ছোটদের সালাম না দেয়, তাহলে শিশুরা শিখবে কার কাছ থেকে? এই আচরণ আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শান্তি আনে।
তিনি শিশুদের নাম ধরে ডাকতেন এবং তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতেন। এক শিশুর পাখি মারা গেলে নবীজি তার মন ভালো করার জন্য স্নেহপূর্ণ কথা বলেছিলেন। এটি তাঁর অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক প্রজ্ঞার পরিচয়।
নামাজেও শিশুদের কষ্ট বিবেচনা
নবীজি নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় শিশুর কান্না শুনলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন। তিনি জানতেন, শিশুর কান্না মায়ের কষ্ট বাড়ায়। এটি তাঁর অসীম সহানুভূতির প্রমাণ।
একবার তাঁর সিজদার সময় তাঁর নাতি পিঠে চড়ে বসেন। নবীজি দীর্ঘ সময় সিজদায় থাকেন, যাতে শিশুর কষ্ট না হয়। এমন আচরণ কেবল একজন আদর্শ মানবের পক্ষেই সম্ভব।
এতিম শিশুদের প্রতি বিশেষ দায়িত্ব
নবীজি এতিম শিশুদের প্রতি বিশেষ মমতা দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এতিমের লালন-পালনকারীর সাথে তিনি জান্নাতে পাশাপাশি থাকবেন। ইসলামে এতিম নির্যাতন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তিনি শিশু হত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। শিশুদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা।
আমাদের জন্য শিক্ষা
নবীজি আমাদের শিখিয়েছেন, দয়া ও ভালোবাসা ছাড়া আদর্শ সমাজ গড়া যায় না। শিশুদের প্রতি ভালো ব্যবহার করলে আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিও দয়া করেন। তাই আমাদের উচিত ছোটদের আদর করা, তাদের সম্মান করা এবং কখনো তাদের ওপর কঠোর না হওয়া।
আজ থেকেই আমাদের প্রতিজ্ঞা করা উচিত, আমরা শিশুদের সঙ্গে সদাচরণ করব। আমরা বড়দের সম্মান করব এবং ছোটদের ভালোবাসব। এভাবেই আমরা নবীজির সুন্নতকে জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারব।