বর্তমান সমাজে অশান্তি যেন সর্বব্যাপী বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—কেউই সহিংসতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের বাইরে নয়। মাদক সহজলভ্য হওয়ায় কিশোর অপরাধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সামান্য কারণেই খুন, দাঙ্গা ও প্রকাশ্য সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার প্রভাব সরাসরি সমাজের স্থিতিশীলতা ও মানুষের মানসিক নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সামাজিক অস্থিরতার মানবিক চিত্র
অর্থনৈতিক সংকট সমাজের দুর্বল মানুষদের আরও বিপর্যস্ত করেছে। কৃষক ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ফসল নষ্ট করতে বাধ্য হচ্ছে। খামারিরা উৎপাদিত দুধ ফেলে দিচ্ছে। অভাবের তাড়নায় বাবা সন্তানের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। শিক্ষিত বেকারত্ব যুবসমাজকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—তরুণ প্রজন্ম স্বপ্ন দেখতে ভয় পাচ্ছে। অথচ তারাই জাতির ভবিষ্যৎ শক্তি।
তরুণ সমাজ ও নৈতিক সাহস
ইতিহাস প্রমাণ করে, নৈতিক সাহসী তরুণরাই সমাজ পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি। ন্যায়, সত্য ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুশৃঙ্খল হয়। যখন শাসক ও জনগণ উভয়েই দায়িত্বশীল আচরণ করে, তখনই অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে আসে। এ জন্য তরুণদের ভয়ের পরিবর্তে নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন >> ইসলামে সম্পদ বৃদ্ধি: হালাল পথ ও আল্লাহর অনুগ্রহ
শান্তিপূর্ণ সমাজের দুটি মূল স্তম্ভ
একটি নিরাপদ সমাজ গঠনের জন্য দুটি বিষয় অপরিহার্য—অনুশাসন ও সুশাসন।
অনুশাসন মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসকে সংশোধন করে। এর মাধ্যমেই ব্যক্তিগত চরিত্র গড়ে ওঠে। আর ব্যক্তির পরিবর্তন থেকেই সমাজের পরিবর্তন শুরু হয়।
সুশাসন এই পরিবর্তনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
সুশাসনের চারটি ভিত্তি
১. নৈতিকতা ও মূল্যবোধ
নৈতিকতা ছাড়া আইন কার্যকর হয় না। নৈতিক সমাজে মানুষের মানবিকতা নিরাপদ থাকে। শাসক ও প্রশাসন নৈতিক হলে সমাজ দ্রুত ইতিবাচক পথে অগ্রসর হয়।
২. ন্যায়বিচার
ন্যায়বিচারই সমাজের প্রকৃত রক্ষাকবচ। ভয়ভীতি, দমন-পীড়ন বা বেআইনি শক্তি প্রয়োগ কখনো স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে অপরাধ কমে যায় এবং মানুষের আস্থা ফিরে আসে। দলীয় পক্ষপাত ও স্বজনপ্রীতি ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় শত্রু।
৩. পরামর্শ গ্রহণ
সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য পরামর্শ অপরিহার্য। শাসকদের পাশাপাশি সমাজের জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামত গ্রহণ করলে ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা কমে যায়। একক সিদ্ধান্ত নয়, সম্মিলিত প্রজ্ঞাই সমাজকে এগিয়ে নেয়।
৪. সমৃদ্ধ রাজকোষ
রাজস্ব ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ করতে হবে এবং বৈধ আয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে উঠলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরবে।
দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতা
যারা ক্ষমতা ও দায়িত্বে থাকে, তাদের প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হয়। দায়িত্বকে সুযোগ নয়, আমানত হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। দায়িত্ব পালনে অবহেলা সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। সততা, বিনয় ও শৃঙ্খলাই একজন দায়িত্বশীলের প্রকৃত গুণ।
বাংলাদেশ ও ভবিষ্যৎ করণীয়
বাংলাদেশ সম্পদশালী দেশ। কিন্তু দূষিত পানি, বায়ু দূষণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে। বিদেশনির্ভর উন্নয়নের চেয়ে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার বেশি প্রয়োজন। নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে দেশের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে।
সমাজের অশান্তির মূল কারণ নৈতিক অবক্ষয় ও ন্যায়বিচারের অভাব। অনুশাসন মানুষের মন গড়ে তোলে, আর সুশাসন সমাজকে সুরক্ষা দেয়। এই দুইয়ের সমন্বয়ই পারে একটি নিরাপদ, মানবিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে।