যিকর শব্দের অর্থ হলো স্মরণ করা। ইসলামী দৃষ্টিকোণে যিকর মানে আল্লাহকে স্মরণ করা। এটি মুখে উচ্চারণ, মনে চিন্তা বা আমলের মাধ্যমে করা যেতে পারে। ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত ও দ্বীনি বৈঠক বা মজলিসে অংশগ্রহণও যিকরের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা বা চিন্তাধারাও একটি ধরণের যিকর। মূলত, আল্লাহর সন্তুষ্টির যে কোনো বিষয় নিয়ে মন, মুখ ও কাজে স্মরণ করাই যিকর।
যিকরের গুরুত্ব ও ফযীলত
পবিত্র কোরআন ও হাদীসে যিকরের বিশাল গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদের স্মরণ করব।” যে ব্যক্তি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করে, সে জীবনে সফলতা অর্জন করে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে, তার তুলনা জীবিত এবং মৃতের মতো।” অর্থাৎ যিকরহীন ব্যক্তি জীবিত থেকেও মৃতের মতো। এমন ব্যক্তি সাধারণ মানুষকে উপকার করতে পারে না।
দ্বীনি বৈঠকে আল্লাহকে স্মরণ করলে ফেরেশতারা তাদের চারপাশে ঘিরে রাখে এবং শান্তি বর্ষিত হয়। আল্লাহ বলেন, “আমি আমার বান্দার নিকটে থাকি, যখন সে আমাকে স্মরণ করে।” এর মানে, যেকোনো অবস্থাতেই আল্লাহর প্রতি ভরসা ও স্মরণ আমাদের জীবনকে নিরাপদ ও সাফল্যমণ্ডিত করে।
এক হাদীসে বর্ণিত আছে, আল্লাহর স্মরণে বসা মানুষরা তাঁর নিকট প্রশংসা ও ক্ষমা প্রাপ্ত হয়। এমনকি যারা শুধু নিজের প্রয়োজনে মজলিসে উপস্থিত থাকে, তারাও আল্লাহর দয়া পায়।
যিকরের প্রকারভেদ
যিকর দুই ধরনের:
- বিশেষ যিকর: সময় বা কাজ অনুযায়ী পাঠ করতে হয়, যেমন ঘুমানোর আগে বা জাগার পরে দোয়া, বিপদে দোয়া ইত্যাদি।
- সাধারণ যিকর: সারাবেলা পড়া যায়, যেমন “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার”। এগুলো যে কোনো সময়ে মুখে উচ্চারণ করা যায়।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, দৈনিক ১০০ বার “সুবহানাল্লাহ” পড়লে সমুদ্রের ফেনার সমপরিমাণ গুনাহ মাফ হয় এবং নেকী লেখা হয়। এছাড়া, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার” ও “আলহামদুলিল্লাহ” পাঠ করলে ব্যক্তি শয়তানের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকে।
যিকর না করার পরিণাম
যিকর না করলে ক্ষতি ও আফসোসের কারণ সৃষ্টি হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন স্থানে বসে বা শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে না, তার জন্য ক্ষতি হবে।” সুতরাং সব সময় যিকর করা উচিত।
মজলিসে আল্লাহর স্মরণ না করলে, এটি বৃথা যায়। এমন বৈঠকে বসা মানুষরা সফলতা পায় না। তাই পারিবারিক, সামাজিক বা ধর্মীয় যে কোনো সভায় আল্লাহকে স্মরণ করা আবশ্যক।
আরও পড়ুন >> মানবাধিকার: ইসলামী ও আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ
যিকরের পদ্ধতি
যিকর করা যায় শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে। আল্লাহ বলেন, “যারা দাঁড়িয়ে, বসে বা শুয়ে আমাকে স্মরণ করে এবং সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে।”
শরীর অশুদ্ধ হলেও পেশাব-পায়খানারত অবস্থায় ছাড়া সর্বাবস্থায় যিকর করা যায়। যিকর নিম্নস্বরে বা চুপচাপ পড়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, উচ্চস্বরে যিকর করার প্রয়োজন নেই।
যিকরের সংখ্যা যেমন হাদীসে নির্দেশ আছে (৩, ৭, ৩৩, ১০০ বার), তা আঙ্গুলে গণনা করা উচিত, তাবসীহ বা অন্য যন্ত্রে নয়। যিকর হবে শুধুমাত্র আল্লাহর নামে। অন্য কারো নামে বা উচ্চস্বরে যিকর বিদ‘আত।
যিকরকে তুলনা করা যায় মুমিনের পরকালীন জমাকৃত ধন-সম্পদের সাথে। নিয়মিত যিকর করলে মানুষের মন ও জীবন ধনী হয়। পার্থিব জীবন শেষ হলেও যিকর আমাদের চিরস্থায়ী পুরস্কার বহন করে। মৃত্যুর সময় মুখে আল্লাহর যিকর রাখা সর্বোত্তম আমল।
যিকর আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে পূর্ণ করে। অপ্রয়োজনীয় কথা, গীবত বা অনর্থক কাজে সময় ব্যয় না করে আল্লাহকে স্মরণ করে আমরা উত্তম মুমিনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারি। আল্লাহ আমাদের আমল-আখলাককে তার পছন্দ অনুযায়ী গড়ে তোলার তাওফীক দিন। আমীন।