ইসলামে ভরণ-পোষণ ও নাফাক্বা: স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়ের অধিকার

ইসলামে সম্পদ ব্যয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিছু ব্যয় ফরয, আবার কিছু নফল। ফরয ব্যয়ের মধ্যে পরিবারের ভরণ-পোষণ অন্যতম। কুরআন ও সুন্নাহতে আয়-ব্যয়ের একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ উপকৃত হয়। পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণ সেই কাঠামোর অপরিহার্য অংশ। এ বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় হকদারের হক আদায় হয় না, আবার খরচের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তও তৈরি হয় না। তাই নাফাক্বা সম্পর্কিত সঠিক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।

ইসলামে স্বামীর দায়িত্ব ও স্ত্রীর অধিকার

পরিবারের ভিত্তি স্বামী ও স্ত্রী। ইসলাম স্বামীর ওপর স্ত্রীর ভরণ-পোষণ, আবাসন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। স্বামী তার সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীর খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে। এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে পরিবারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। ইসলামী শরিয়তে এই দায়িত্বকে ফরয করা হয়েছে, অর্থাৎ ইচ্ছাধীন নয়।

আরও পড়ুন >> দাম্পত্য জীবনের প্রস্তুতি: সুখী সংসারের বাস্তব দিকনির্দেশনা

ভরণ-পোষণে সামর্থ্যের ভারসাম্য

স্বামী তার আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে খরচ করতে বাধ্য নয়। একইভাবে স্ত্রী স্বামীর সামর্থ্যের অতিরিক্ত দাবি করতে পারে না। স্বাভাবিক প্রয়োজন পূরণই এখানে মূলনীতি। এই ভারসাম্য রক্ষা করলে দাম্পত্য জীবনে বিরোধ কমে এবং পারস্পরিক সম্মান বৃদ্ধি পায়।

তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর ভরণ-পোষণের বিধান

তালাকের পর ইদ্দতকালীন সময় পর্যন্ত স্ত্রীর ভরণ-পোষণ স্বামীর দায়িত্ব। স্ত্রী গর্ভবতী হলে সন্তান জন্ম দেওয়া পর্যন্ত এই দায়িত্ব বহাল থাকে। সন্তান জন্মের পর মা যদি শিশুকে দুধ পান করান, তবে স্বামীকে পারিশ্রমিক দিতে হবে। তবে ইদ্দত শেষ হওয়ার পর স্ত্রীর ব্যক্তিগত ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আর স্বামীর ওপর থাকে না, শুধু সন্তানের প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করতে হয়।

স্ত্রীর ভরণ-পোষণে ফযীলত

স্ত্রীর জন্য খরচ করা ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। হাদীছে এ ব্যয়কে সর্বোত্তম সদকা বলা হয়েছে। পরিবারের জন্য খরচ করলে ব্যক্তি দ্বিগুণ লাভবান হয়—একদিকে ফরয আদায় হয়, অন্যদিকে সদকার সওয়াব পাওয়া যায়। নিয়ত যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি হয়, তবে এই ব্যয় ইবাদতে পরিণত হয়।

সন্তানের, বিশেষত কন্যার ভরণ-পোষণ

সন্তানের ভরণ-পোষণ পিতার দায়িত্ব। ইসলামে পুত্র ও কন্যার মধ্যে এই ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য নেই। তবে কন্যা সন্তানের লালন-পালনের জন্য বিশেষ ফযীলতের কথা হাদীছে এসেছে। কন্যাদের সঠিকভাবে প্রতিপালন করলে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। এতে সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়।

পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের গুরুত্ব

সামর্থ্যবান সন্তানের ওপর পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ ফরয। তাদের প্রতি সদাচরণের অন্যতম প্রকাশ হলো প্রয়োজনের সময় আর্থিক সহায়তা করা। বার্ধক্যে পৌঁছালে পিতা-মাতার খরচ বহনে অবহেলা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দিত। মায়ের সেবা ও ভরণ-পোষণের গুরুত্ব আরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বোন ও আত্মীয়স্বজনের নাফাক্বা

বোন ও নিকটাত্মীয়দের সাহায্য করা ইসলামে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি নফল, আবার কারো চরম অভাব হলে তা ওয়াজিব হয়ে যায়। আত্মীয়কে দান করলে একসঙ্গে সদকা ও আত্মীয়তার হক আদায় হয়, যা সাধারণ দানের চেয়ে অধিক সওয়াবের কারণ।

উদ্বৃত্ত সম্পদ দানের নীতি

পরিবারের প্রয়োজন পূরণের পর যে সম্পদ উদ্বৃত্ত থাকে, তা দান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিজের বা পরিবারের মৌলিক চাহিদা উপেক্ষা করে দান করা ইসলামের উদ্দেশ্য নয়। ভারসাম্যপূর্ণ দানই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য।

ইসলামের নাফাক্বা ব্যবস্থা একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো। এই ব্যবস্থার সঠিক জ্ঞান ও বাস্তব প্রয়োগ পরিবারকে সুদৃঢ় করে এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। ওয়াজিব হক আদায়ের পাশাপাশি নফল দানে উৎসাহিত হওয়াই একজন মুমিনের পরিচয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top