বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে অশ্লীলতা একটি ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে সমাজের নৈতিকতা দিন দিন ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। বিশেষ করে যুবসমাজ এর দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অশ্লীলতার কারণে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, দাম্পত্য জীবনে অশান্তি বাড়ছে এবং বিবাহ বিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই অশ্লীলতার বিস্তার রোধ করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
ইসলামের দৃষ্টিতে অশ্লীলতা
ইসলাম মানব চরিত্র সংরক্ষণে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। অশ্লীলতা মানুষের আত্মিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। তাই ইসলাম শুধু অশ্লীল কাজ নয়, বরং অশ্লীলতার দিকে নিয়ে যায় এমন সব পথ থেকেও দূরে থাকতে নির্দেশ দেয়। চরিত্র রক্ষাই ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্য। কারণ চরিত্র নষ্ট হলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সবকিছুই ধ্বংসের মুখে পড়ে।
অশ্লীলতার সংজ্ঞা ও ব্যাপ্তি
অশ্লীলতা বলতে এমন সব কথা, কাজ ও আচরণকে বোঝায়, যা মানুষের স্বাভাবিক লজ্জাবোধ নষ্ট করে এবং পাপের দিকে ধাবিত করে। এটি শুধু শারীরিক অনৈতিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং অশালীন কথা, কুরুচিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, অশোভন পোশাক ও অশ্লীল বিনোদন—সবই এর অন্তর্ভুক্ত।
অশ্লীলতা প্রসারের প্রধান মাধ্যমসমূহ
নেশাদার দ্রব্যের ব্যবহার
মাদক ও নেশাজাত দ্রব্য মানুষের বিবেক ও নিয়ন্ত্রণশক্তি ধ্বংস করে। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি সহজেই অশ্লীল ও অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে।
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
ইন্টারনেট অশ্লীলতা ছড়ানোর অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ ছবি ও ভিডিও সহজেই তরুণদের আকৃষ্ট করছে। এতে তাদের মানসিক ও নৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।
পর্নোগ্রাফি
পর্নোগ্রাফি যুবসমাজকে দ্রুত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটি কৃত্রিম উত্তেজনার মাধ্যমে অবৈধ সম্পর্ক, যৌন অপরাধ ও পারিবারিক অশান্তি বাড়াচ্ছে।
গান, সিনেমা ও বিনোদন
অনেক গান, সিনেমা ও নাটকে অশালীন দৃশ্য ও সংলাপ দেখানো হচ্ছে। এসব বিনোদনের নামে অশ্লীলতা সমাজে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
সহশিক্ষা ও অবাধ মেলামেশা
ছেলে-মেয়ের অবাধ মেলামেশা অনেক সময় অনৈতিক সম্পর্কের দিকে নিয়ে যায়। এতে ইভটিজিং ও যৌন হয়রানির ঘটনাও বাড়ছে।
কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অবাধ সহাবস্থান
একই কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাজ করার ফলে অনেক ক্ষেত্রে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর প্রভাব পড়ে পারিবারিক জীবনে।
পর্দাহীনতা ও অশালীন পোশাক
সংকীর্ণ ও অশালীন পোশাক মানুষকে কুপ্রবৃত্তির দিকে আকৃষ্ট করে। এটি অশ্লীলতা বিস্তারের অন্যতম কারণ।
সমাজে অশ্লীলতার ভয়াবহ কুপ্রভাব
পরকীয়া ও বিবাহ বিচ্ছেদ
অশ্লীলতা পরকীয়ার পথ সুগম করে। ফলে ভেঙে যায় সুখী সংসার এবং বাড়ে বিবাহ বিচ্ছেদ।
আত্মহত্যা
প্রেমে ব্যর্থতা, সামাজিক লজ্জা ও পারিবারিক ভাঙনের কারণে অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
ধর্ষণ ও যৌন অপরাধ
অশ্লীলতা মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ায়। ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার পেছনে এটি বড় ভূমিকা রাখে।
যৌনবাহিত রোগ
বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কারণে মারাত্মক যৌনবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে, যা সমাজের জন্য বড় হুমকি।
অশ্লীলতা প্রতিরোধে করণীয়
একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও নৈতিক সমাজ গড়তে হলে অশ্লীলতা প্রতিরোধ করা অপরিহার্য। এর জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের মাধ্যমে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেই সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব।