আল-বাকারাহ

এখানে আমরা সুরা বাকারাহ সম্পর্কে জানব

‘বাকারা’ মানে ‘গাভি’। বনী ইসরাঈলের এক লোক খুন হলো। বিবাদ মেটাতে তারা মুসা-এর কাছে গেল। মুসা বললেন-এক কাজ করো, একটা গাভি জবাই করো। তারপর ওটার একটা অংশ দিয়ে খুন-হওয়া লোকটির গায়ে সামান্য আঘাত করো। দেখবে সে দিব্যি জীবিত হয়ে খুনির নাম বলে দিচ্ছে। কিন্তু বনী ইসরাঈল বলে কথা! এরকম একটা সহজ হুকুমকেও তারা প্রশ্নের-পর-প্রশ্ন করে জটিল করে তুলল! এ-সূরার ৬৭ থেকে ৭৩ নং আয়াতে সেই ঘটনাই জায়গা পেয়েছে। সেখান থেকেই সূরার নাম হয়েছে ‘বাকারা’।

শানে নুযুল

হিজরত করে মদীনায় এলেন নবিজি। মদীনার অ-দূরেই ইহুদিদের বসতি। ইহুদিরা নিজেদেরকে তাওরাতের অনুসারী দাবি করত। ফলে ইসলাম, রাসূল বা আসমানি কিতাব-এগুলো সম্পর্কে ওদের ভালোই জানাশোনা। সেই হিসেবে আশা ছিল-নবিজি মদীনায় ঠাঁই নেওয়া-মাত্রই, ইসলাম কবুল করবে ইহুদিরা। কিন্তু তা ঘটল না, ঘটল ঠিক উলটোটা। ইহুদিরা নবিজিকে চিনেও, না চেনার ভান করল, সত্য মেনে নিতে রাজি হলো না। কারণ কী? ইহুদিরা আসলে তাওরাত অনুসরণ করত নামে মাত্র। তাওরাতের যেসব বিধান ওদের রুচি-মতো হতো না, সেগুলো ওরা বদলে ফেলত। নিজেরা নিজেরা আইন বানাত, আর সুযোগ বুঝে তা ‘আল্লাহর বিধান’ বলে চালিয়ে দিত। সুদ, যিনা, মিথ্যা কথা-এসব ছিল ওদের কাছে ডালভাত। তো, ওরা যখন দেখল, নবিজির অনুসরণ করলে পাপের দরজায় খিল পড়বে, খায়েশ-মতো আর কুকর্ম করা যাবে না, তখনই ওরা বেঁকে বসল। আল্লাহ তখন এ-সূরার বেশ অনেকগুলো আয়াত ওদের সম্বোধন করে নাযিল করলেন। ঝকঝকে আয়নার মতো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হলো ইহুদিদের সত্যিকার ইতিহাস। আল্লাহ ওদেরকে জানিয়ে দিলেন-তোমরা যে নিজেদেরকে তাওরাতের অনুসারী দাবি করছো, তা মোটেও সত্য নয়। এই যে তোমাদের ইতিহাসের দলিল-দস্তাবেজ। আবার সে-সময়টায় মদীনাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে লাগল মুনাফিকরা। তাদেরকে নিয়েও আলোচনা হলো বিস্তর। তা ছাড়া মদীনা ততদিনে একটি ছোটখাটো ইসলামি রাষ্ট্র। রাষ্ট্র চালাতে আইন লাগে। এই সূরার মাধ্যমে ধাপে ধাপে সেই আইন পাঠানো হলো। নাগরিক জীবন, সামাজিক জীবন, অর্থনীতি, রাজনীতি-ইত্যাদি ব্যাপারে একটি ইসলামি রাষ্ট্রের আইনি রূপরেখা কেমন হবে, তার খুঁটিনাটি আলাপ নিয়েই সূরাটি নাযিল করা হয়েছে।

(দেখুন-ইবনু কাসীর, তাফসীর, ১/২৩৯; বাগাবি, তাফসীর, ১/১৮০; যামাখশারি, আল-কাশশাফ, ১/৫৩৩)

ফজিলত

اقْرَؤُوا الْبَقَرَة؛ فَإِنَّ أَخْذَهَا بَرَكَةً، وَتَرَكَهَا حَسْرَةً وَلَا يَسْتَطِيعُهَا الْبَطَلَة

সূরা বাকারা পড়ো। কেননা, তা আঁকড়ে ধরায় বরকত। আর ছেড়ে দেওয়ায় আফসোস। তা ছাড়া জাদুকররা ওটার সামনে টিকতে পারে না।” (মুসলিম, ৮০৪)

নবিজি আরও বলেছেন: “তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ো না। মনে রাখবে, যে-ঘরে সূরা বাকারা পাঠ করা হয়, শয়তান সে-ঘর থেকে পালিয়ে যায়।” (মুসলিম, ৭৮০)

নবিজি বলেছেন, “যে-ব্যক্তি (কুরআনের) প্রথম সাতটি সূরা আঁকড়ে ধরে, সে জ্ঞানী।” (আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২৪৪৪৩, হাসান)

গতিপথ :

সেন্ট্রাল থিম: “বনী ইসরাঈলের হাত থেকে বনী ইসমাঈলের হাতে নেতৃত্বের পরিবর্তন।”

১. আল্লাহর প্রতিনিধি: মানুষকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে। দুনিয়ার বুকে আল্লাহর আইন কার্যকর করাই হলো মানুষের প্রধান দায়িত্ব।

২. বনী ইসরাঈলের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা ও শিক্ষা: সময়ের ধারাবাহিকতায় বনী ইসরাঈলের ওপরও সেই একই দায়িত্ব বর্তায়। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতাও তারা হারিয়ে ফেলে।

৩. স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে মুসলিমদের উত্থান: পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের এই দায়িত্ব আল্লাহ বনী ইসমাঈল অর্থাৎ মুসলিম-জাতিকে দিলেন। নেতৃত্বের পালাবদলের দৃষ্টান্ত হিসেবে মুসলিমদের জন্য কিবলার দিক পরিবর্তন করে দিলেন তিনি।

৪. আইন ও নৈতিকতা: নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নৈতিকতা। তাই মুসলিমদের জন্য আল্লাহ ঠিক করে দিলেন-ন্যায় ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ পরিচালনার ফ্রেমওয়ার্ক। প্রণয়ন করলেন ইসলামের বেশকিছু মৌলিক বিধান।

আয়াতওভারভিউ
১-২০মুত্তাকীদের গুণাবলি এবং কাফির-মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য।
২১-৩৯আদম সৃষ্টির ঘটনা, ইবলিসের প্রতিক্রিয়া এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করায় দুনিয়ার বুকে মানুষের অবতরণ।
৪০-৭৪দুনিয়ায় মানব-জাতির ক্রমধারায় বনী ইসরাঈলের আগমন। তাদের লাগাতার অবাধ্যতা ও ফলস্বরূপ লাঞ্ছনার কাহিনি।
৭৫-১২৩শুধু নবিজি নন, ইহুদিরা মুসা -এর সাথেও বেয়াদবি করেছে। তাদের সেই অবাধ্যতা ও ষড়যন্ত্র আজও চলমান।
১২৪-১৪১হযরত ইব্রাহিম আলাইহি সালাম ছিলেন সঠিক পথের দিশারি। তিনি মুসলিমদের অনুসরণীয় আদর্শ। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের দাবি সম্পূর্ণ বানোয়াট।
১৪২-১৭৭ইহুদি-খ্রিষ্টান বা অন্য কোনো ধর্মের রীতি-রেওয়াজ-সংস্কৃতি মুসলিমরা অনুসরণ করতে পারে না।
১৭৮-২০৩ওয়ারিশ বণ্টন, রোযা, হজ্জ, কিসাস ও জিহাদ বিষয়ে বেশকিছু নির্দেশনা এসেছে। দেওয়া হয়েছে প্রকৃত আনুগত্যের পরিচয়।
২০৪-২৪২সবর করার গুরুত্ব ও পুরস্কার সম্পর্কিত আলোচনা। এসেছে বিয়ে, তালাক ও দুগ্ধপোষ্য-সন্তানের ক্ষেত্রে কিছু বিধি-বিধান।
২৪৩-২৭৪পুনরুজ্জীবনের দুটি বিস্ময়কর নজির তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি শেখানো হয়েছে দান-সাদাকা করার ইসলামি আদব।
২৭৫-২৮৬সুদের ক্ষতি ও লেনদেনে স্বচ্ছতার গুরুত্ব সম্পর্কিত আলোচনা। একটি চমৎকার দুআ দিয়ে সূরার সমাপ্তি।

সবশেষে বলা যায়, সূরা বাকারা কুরআনের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং বিস্তৃত সূরা হলেও, এর প্রতিটি আয়াত মুসলমানদের জন্য দিকনির্দেশনা, শিক্ষা ও শক্তির উৎস। এতে যেমন অতীত জাতির ইতিহাস ও ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান রয়েছে, তেমনি রয়েছে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন গড়ার আহ্বান। সূরাটি আমাদের শেখায়—আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে দুনিয়ায় ন্যায়, সততা ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা আমাদের দায়িত্ব। যারা একে হৃদয়ে ধারণ করে, তাদের জীবনে আসে বরকত, শান্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। তাই সূরা বাকারা শুধু একটি অধ্যায় নয়, বরং এটি এক পূর্ণাঙ্গ জীবনপথের দিশারি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top