তাক্বলীদ বনাম ইত্তেবা: ইসলামী জীবনবিধানে সঠিক পথ

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতির জন্য অবতীর্ণ করেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মুসলমানগণ ইসলামের বিধান পালন থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে তাক্বলীদ বনাম ইত্তেবা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে তাক্বলীদ ও ইত্তেবার মধ্যে পার্থক্য, ইতিহাস এবং প্রয়োগ সম্পর্কে আলোচনা করব।


তাক্বলীদ: সংজ্ঞা ও অর্থ

তাক্বলীদ শব্দটি এসেছে ‘ক্বালাদাতুন’ থেকে, যার অর্থ কারো উপর আনুগত্যের রশি বেঁধে দেওয়া। পারিভাষিকভাবে, শারঈ বিষয়ে কোন আলেম বা মুজতাহিদের কথাকে বিনা দলীল-প্রমাণে গ্রহণ করা তাক্বলীদ। আল্লামা জুরজানী, ইমাম শাওকানী ও মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্বীত্বী প্রমুখ আলেমরা সকলেই তাক্বলীদকে বিনা দলীল গ্রহণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

তাক্বলীদের প্রকারভেদ:

  1. জাতীয় তাক্বলীদ: নির্দিষ্ট মাযহাব বা তরীকার অন্ধ অনুসরণ।
  2. বিজাতীয় তাক্বলীদ: সমাজে প্রচলিত বৈষয়িক মতবাদের অন্ধ অনুসরণ, যেমন: পুঁজিবাদ, গণতন্ত্র।

ইত্তেবা: নবী অনুসরণের সত্যপন্থা

ইত্তেবা হলো কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী নবীর বিধান অনুসরণ করা। পক্ষান্তরে তাক্বলীদ হলো রায় অনুসরণ; ইত্তেবা হলো রেওয়ায়াত অনুসরণ। ইমাম শাওকানী স্পষ্টভাবে বলেছেন, “ইত্তেবা ইসলামে বৈধ, তাক্বলীদ নিষিদ্ধ।”


প্রসিদ্ধ চার ইমামের নির্দেশনা

ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের সকলেই তাক্বলীদ নিষিদ্ধ করেছেন। তারা বলেন:

  • যদি হাদীছ বা কুরআন বিরোধী হয়, তা প্রত্যাখ্যান করুন।
  • একজন আলেমের কথা শুধুমাত্র তখন গ্রহণযোগ্য যখন তা কুরআন ও সুন্নাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
  • ছাহাবা ও তাবেইনের যুগে কেউ কারো অন্ধ অনুসারী ছিল না।

তাক্বলীদের উৎপত্তি ও ইতিহাস

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও ছাহাবাদের যুগে তাক্বলীদ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। ৪র্থ শতাব্দী হিজরীতে বিভিন্ন মাযহাবের নাম অনুসারে তাক্বলীদ শুরু হয়। শাহ অলিউললাহ দেহলভী উল্লেখ করেছেন, এর আগের যুগে মানুষ বিভিন্ন আলেমের নিকট থেকে ফৎওয়া নিত এবং মাযহাব যাচাই করত না।

আরও পড়ুন >> যিকর: মুসলিম জীবনে আল্লাহকে স্মরণের গুরুত্ব


কার জন্য বৈধ ও কার জন্য অবৈধ?

  1. মুজতাহিদ ও উচ্চ জ্ঞানসম্পন্ন আলেম: অন্য কারো তাক্বলীদ বৈধ নয়।
  2. মধ্যম জ্ঞানসম্পন্ন আলেম: কুরআন ও হাদীছ যাচাই ছাড়া অন্যের তাক্বলীদ গ্রহণ নিষিদ্ধ।
  3. সাধারণ মানুষ: শারঈ বিষয়ে জ্ঞান না থাকলে যোগ্য আলেমের নিকট জিজ্ঞেস করা বৈধ, কিন্তু নির্দিষ্ট মাযহাবের অন্ধানুসরণ নয়।

মাযহাবী গোঁড়ামি এবং তার বিপর্যয়

নির্দিষ্ট মাযহাবের অন্ধানুসরণের ফলে মুসলমানগণ কুরআন ও হাদীছের নির্দেশ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ বলেছেন, যেকোন নতুন বিষয় আসলে মাযহাবের গোঁড়ামি ত্যাগ করে দলীল অনুযায়ী কাজ করা ওয়াজিব।


উপসংহার

ইসলামে নবীর ইত্তেবা ও কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণই মূল। তাক্বলীদ শুধু দলীলবিহীন রায়ের অনুসরণ। মুসলিমদের জন্য সতর্কবার্তা হলো: কুরআন ও হাদীছ থেকে দূরে সরে গেলে ইসলামী জীবনবিধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সব সিদ্ধান্তে দলীলবিহীন অন্ধ অনুসরণ ত্যাগ করে কেবল নবীর বিধান অনুসরণ করাই উত্তম পথ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top