অহংকার হলো নিজের বড়ত্ব প্রদর্শন করা এবং অন্যকে হীন মনে করা। এটি শুধু দাম্পত্য বা সমাজিক অবস্থার নয়, বরং মানব আত্মার এক গভীর ব্যাধি। একজন অহংকারী ব্যক্তি সত্যকে অস্বীকার করে এবং মানুষকে ঘৃণা করে। ইসলামী শিক্ষায় বলা হয়েছে, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। তবে পোশাক বা বাহ্যিক সৌন্দর্যকে সুন্দর করা অহংকার নয়। প্রকৃত অহংকার হলো সত্য ও ন্যায় অস্বীকার এবং মানুষের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন।
অহংকারের ধ্বংসাত্মক প্রভাব
অহংকার মানুষকে ধ্বংসের পথে ধাবিত করে। ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি পরিবার এবং সমাজও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যারা অহংকারে আক্রান্ত, তারা আল্লাহর দাসত্বের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। শায়খুল ইসলাম আহমাদ ইবনু তায়মিয়্যার মতে, অহংকার শিরকের চেয়েও নিকৃষ্ট। কারণ একজন মুশরিক আল্লাহর দাসত্বের সাথে অন্যকে শেয়ার করে, কিন্তু অহংকারী তার নিজ দাসত্বকেও অবজ্ঞা করে।
আরও পড়ুন >> তাক্বলীদ বনাম ইত্তেবা: ইসলামী জীবনবিধানে সঠিক পথ
অহংকারের প্রধান কারণ
- ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততির আধিক্যতা: সম্পদ ও সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষার অংশ। কারূনের উদাহরণ আমাদের শেখায়, অতিরিক্ত ধনসম্পদ অহংকার জন্ম দিতে পারে। আল্লাহ বলেন, যারা ধন ও সন্তানকে স্মরণ থেকে বিরত রাখে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।
- ইলম বা বিদ্যার অহংকার: জ্ঞান যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয়, তা অহংকার সৃষ্টি করে। এমন জ্ঞানীরা অন্যকে হীন মনে করে এবং জান্নাত থেকে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে, সত্যিকারের জ্ঞান অর্জনকারী বিনয়ী ও তাকওয়াশীল হয়ে নিজের অন্তরকে অহংকারমুক্ত রাখে।
- বংশমর্যাদা: বংশীয় মর্যাদা কেবল তখনই কার্যকর, যখন ব্যক্তি তাকওয়া ও সৎচেতনার অধিকারী। অন্যথায়, এটি অহংকার জন্ম দেয় এবং সত্যিকারের সম্মান অর্জনে ব্যর্থ হয়।
- পদমর্যাদা: উচ্চ পদবি মানুষকে অহংকারী করে তুলতে পারে। ইসলামী শিক্ষায় বলা হয়েছে, যারা দায়িত্বের স্থলে দায়িত্ব পালন করেন, তারা তাদের কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
- আল্লাহর দাসত্বে অহংকার: মানুষ তার সৃষ্টিকর্তার দাসত্ব ভুলে গেলে অহংকার জন্মায়। এ কারণে তার অন্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং সমাজে দমন ও অমর্যাদা সৃষ্টি হয়।
অহংকার প্রতিকার
- ছোটো কাজ করার মানসিকতা: সাধারণ কাজ নিজেই করা, অন্যের সাথে অংশগ্রহণ করা ও নমনীয়তা প্রদর্শন অহংকার কমায়। যেমন, রাসূলুল্লাহ নিজে জুতা ঠিক করতেন, কাপড় সেলাই করতেন এবং গৃহস্থালির কাজ করতেন।
- মৃত্যুকে স্মরণ করা: মৃত্যুর স্মরণ হৃদয়কে অহংকারমুক্ত রাখতে সহায়ক। আল্লাহ বলেন, মৃত্যু যেখানেই থাকুন আপনাকে পাবেই।
- গোপন আমল করা: নেক কাজ গোপনে করা ও আল্লাহর জন্য করা অহংকার কমায়। ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, গোপন দান ও প্রার্থনা অন্তরের অহংকার দূর করে।
- দ্রুত অহংকার পরিহার করা: দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ অহংকার পরিহার করা জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্য।
- দোয়া করা: হৃদয়কে অহংকারমুক্ত রাখতে আল্লাহর নিকট নিয়মিত প্রার্থনা করা আবশ্যক।
অহংকার মানব জীবনের জন্য ক্ষতিকর এবং ধ্বংসাত্মক। যিনি অহংকারমুক্ত হন, তিনি নিজেকে এবং সমাজকে সমৃদ্ধি দিতে সক্ষম হন। আসুন, অহংকার ত্যাগ করি, বিনয়ী হই এবং আল্লাহর প্রতি দাসত্ব বজায় রাখি। আল্লাহ আমাদের হৃদয়কে অহংকার থেকে মুক্ত রাখুন—আমীন।