আল্লাহ মানুষকে এই পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, একমাত্র তাঁরই ইবাদতের উদ্দেশ্যে। যুগে যুগে তিনি নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং কিতাব অবতরণ করেছেন, যাতে মানবজাতি আল্লাহর স্বতন্ত্র পরিচয় জানতে পারে এবং শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করে। সমস্ত প্রার্থনা, ভরসা ও আশা কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। কোনো কর্মকাণ্ড যদি আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে যুক্ত করে, তা শিরক হিসেবে গণ্য হয়।
শিরক হল আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ইলাহ বা মা‘বূদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। মূলত, সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমতুল্য করা শিরকের মূল। ক্ষতি ও উপকার, দান ও ত্যাগের একক অধিকার শুধুমাত্র আল্লাহর। যদি এই ক্ষমতাগুলো কোনো সৃষ্টির সাথে সংযুক্ত করা হয়, তাহলে সে ব্যক্তি মুশরিক হয়। আল্লাহর সাথে কোন মাধ্যম স্থাপন করা বা তাঁকে ছাড়াই সাহায্য প্রার্থনা করা তাঁর একত্ব ও প্রভুত্বের প্রতি আঘাত।
শিরকের ভয়াবহতা
শিরক জঘন্যতম পাপ, যা ক্ষমা হয় না। শিরক মিশ্রিত আমল গ্রহণযোগ্য নয়। যারা জীবনেই শিরক করে এবং তওবা না করে মারা যায়, তাদের সব সৎকর্ম নষ্ট হয়ে যায়। কুরআনে আল্লাহ বলেন, যারা নিজেদের সৎকর্মে সফল মনে করেও শিরক করে, তাদের কাজ বিক্ষিপ্ত ধূলিকণার মতো উড়িয়ে দেওয়া হবে।
নবী ও রাসূলদের আহবান
প্রতিটি নবী বা রাসূল মানুষের কাছে প্রথমে তাওহীদের দিকেই আহবান করেছেন। শিরক থেকে বেঁচে থাকার জন্য বারবার সতর্ক করেছেন। মুহাম্মদ (ছাঃ) তাঁর জীবন এবং প্রচেষ্টা মূলত তাওহীদ প্রচারের জন্য ব্যয় করেছেন। সুতরাং বান্দার প্রথম দায়িত্ব হলো তাওহীদের সঠিক জ্ঞান অর্জন, ঈমান ও আমলকে শিরক মুক্ত রাখা এবং জীবনব্যাপী তা রক্ষা করা।
আরও পড়ুন >> কুরআন ও হাদীছের সম্পর্ক: ইসলামী শরী‘আতের দুই মৌলিক উৎস
সমাজে প্রচলিত শিরক
আমাদের সমাজে নানা ধরনের শিরক ও কুসংস্কার প্রচলিত আছে। যেমন:
- অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর গায়েবী ক্ষমতায় বিশ্বাস করা।
- জ্যোতির্বিদ্যা ও গ্রহ নক্ষত্র: নক্ষত্র, গ্রহ বা চন্দ্রসূর্যের প্রভাবকে মানব জীবনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে গ্রহণ করা।
- যাদু, টোনা ও কুপ্রভাব: শত্রুতা দূর বা ভালোবাসা, স্বাস্থ্য, ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যাদুর আশ্রয় নেওয়া।
- তাবিজ ও ধাতব পদার্থ ব্যবহার: রোগ বা দুর্ভাগ্য প্রতিরোধে আংটি, বালা বা তাবিজ ব্যবহার করা।
- মাজার, পীর ও ওলীর প্রতি অতিরিক্ত সম্বর্ধনা: মাজারের মাটি, মোমবাতি, ছবি বা গিলাফকে বরকতের হিসেবে গ্রহণ করা।
- শুভ-অশুভ আলামতে বিশ্বাস: যেকোনো বস্তু, সময় বা প্রাকৃতিক ঘটনার মাধ্যমে ভাগ্য নির্ধারণ করা।
- গায়রুল্লাহর নামে কসম বা সাহায্য চাওয়া: আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যকারী বা দাবিদার ধরা।
এসব কুসংস্কার মানুষের মধ্যে শিরক বিস্তার ঘটায় এবং তাওহীদ রক্ষা বাধাগ্রস্ত করে।
আরও পড়ুন >> সমাজে প্রচলিত কিছু শিরক
শিরক থেকে রক্ষা পাওয়ার দো‘আ
শিরক থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট সর্বদা দো‘আ করা উচিত। রাসূল (ছাঃ) শিখিয়েছেন:
“হে আল্লাহ, আমরা আপনার নিকট আশ্রয় চাইছি, জেনে বুঝে শিরক থেকে রক্ষা পাবার জন্য। আমাদের অজ্ঞাত শিরক থেকে ক্ষমা দান করুন।”
শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নিজেকে ও সমাজকে শিরক থেকে দূরে রাখা মুসলিমের জন্য অপরিহার্য।
শিরক থেকে বাঁচা প্রতিটি মুসলিমের মৌলিক দায়িত্ব। শিরক না করা, ঈমান ও আমলকে স্বচ্ছ রাখা, আল্লাহর একত্বে দৃঢ় থাকা প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ছোট-বড় সকল প্রকার শিরক থেকে রক্ষা করুন।