ইসলামে ঘুষ দেওয়া ও গ্রহণ – দুইটিই কঠোরভাবে হারাম। হাদিসে বলা হয়েছে, রাসুল (স.) ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়কে অভিশাপ দিয়েছেন। ঘুষ সমাজকে দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয় এবং ন্যায় বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই ইসলামে এটি বড় পাপ হিসেবে বিবেচিত।
হারাম উপার্জনের ভয়াবহ পরিণতি
রাসুল (স.) সতর্ক করেছেন যে, যে দেহ হারাম সম্পদে গড়ে ওঠে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। হারাম উপার্জন মানুষকে আধ্যাত্মিকভাবে ধ্বংস করে এবং দোজখের দিকে ঠেলে দেয়। আরেক হাদিসে বলা হয়েছে, যে দেহ হারাম খাদ্যে গঠিত হয়, তার জন্য জাহান্নামের আগুনই উপযুক্ত। এই সতর্কবাণী মানুষকে সৎ উপার্জনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ করে।
ঘুষ ও সুদ: ঘৃণ্য কর্ম
হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে এক দিরহাম পরিমাণ সুদ গ্রহণ করে, তার পাপ ৩৬ বার ব্যভিচারের চেয়েও বেশি। ঘুষ ও সুদ – দুটোই নৈতিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে এবং সমাজে ফিতনা ছড়ায়। তাই এ দুটির প্রতি ইসলামের সতর্ক অবস্থান খুবই কঠোর।
আরও পড়ুন>> সূদ: ইসলামিক দৃষ্টিকোণ এবং ক্ষতিকর প্রভাব
হাদিয়া ও ঘুষের মধ্যে পার্থক্য
ইসলামে হাদিয়া গ্রহণ বৈধ। হাদিয়ায় থাকে ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্দেশ্য। কিন্তু ঘুষের উদ্দেশ্য থাকে ব্যক্তিগত লাভ। তাই উদ্দেশ্যই এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। সমাজে অনেকেই ঘুষকে হাদিয়া বা বকশিশ নামে চালিয়ে নিতে চায়। এতে পাপ কমে না; বরং এ ধরনের ছলনা মানুষকে আরও অপরাধে উৎসাহিত করে।
দায়িত্ব পালনে ঘুষ গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা
রাসুল (স.)-এর সময়ে একজন কর্মচারী সরকারি মাল থেকে আলাদা করে বলেছিল—একটি অংশ তাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। তখন রাসুল (স.) কঠোর ভাষায় বলেছিলেন, যদি এটি সত্য নৈতিক উপহার হতো, তবে মানুষ তার নিজের ঘরেই তা দিত। অর্থাৎ সরকারি দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে উপহার নেওয়া আসলে ঘুষ। এ ধরনের আচরণকে নবীজি (স.) খেয়ানত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ঘুষ আত্মসাৎকারীদের জন্য কঠোর সতর্কতা
হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাৎ করে, কেয়ামতের দিন সে সেই জিনিস কাঁধে নিয়ে আদালতে হাজির হবে। এটি বোঝায় যে, ঘুষগ্রহণকারীর পাপ শুধু এ দুনিয়ায় নয়, পরকালেও তাকে অপমানে ফেলে দেবে। তদুপরি, হাদিসে বলা হয়েছে যে, যারা মানুষের কাছে বারবার চেয়ে বেড়ায়, তাদের মুখমণ্ডলে কেয়ামতের দিন কোনো গোশত থাকবে না। এটি ঘুষ গ্রহীতার নৈতিক শূন্যতাকে প্রকাশ করে।
দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ
হারাম উপার্জন দোয়া কবুল হতে বাধা সৃষ্টি করে। এক সাহাবি রাসুল (স.)-কে দোয়া কবুলের জন্য পরামর্শ চাইলে তিনি বলেছিলেন, নিজের খাদ্য ও উপার্জন হালাল করো। এতে দোয়া কবুল হবে। ঘুষগ্রহণ মানুষকে এ হালাল জীবনের পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
জনগণের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার গর্হিততা
রাষ্ট্র জনগণের ট্যাক্স থেকে কর্মচারীদের বেতন দেয়। তাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য জনগণের কাছ থেকে কোনো উপঢৌকন, খাবার, উপহার বা সুবিধা নেওয়া নাজায়েজ। এটি ঘুষ ও বড় গুনাহ। দায়িত্ব পালনে অতিরিক্ত সুবিধা দাবি করা খেয়ানতের শামিল।
কোরআনে ঘুষের নিন্দা
ইহুদিদের প্রসঙ্গে কোরআনে এসেছে যে, তারা অবৈধ অর্থ গ্রহণে লিপ্ত ছিল। এতে বোঝা যায়, ঘুষ অত্যন্ত জঘন্য পাপ। কোরআনে বলা হয়েছে—মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং বিচারককে উৎকোচ দিয়ো না। এ নির্দেশ ঘুষের সব রূপকে নিষিদ্ধ করে।
হারাম লেনদেনের কারণ
মুফতি শফি (রহ.) বলেছেন, ইসলামে যত ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ, তার সবগুলোর মূল কারণ হলো—প্রতারনা, অজ্ঞতা, ক্ষতি, জুলুম বা অন্যের হক নষ্ট করা। ঘুষ ও সুদ এসব অবৈধ আচরণের মধ্যে পড়ে। তাই এগুলো পুরো সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক।
ঘুষ: আজকের সমাজে মহামারী
ঘুষ এখন সমাজে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক কর্মকর্তা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, গরিব মানুষের কাছ থেকেও ঘুষ নিতে তারা লজ্জা বোধ করে না। ফাইল সামনে রেখেও কাজ করে না যতক্ষণ না ঘুষের টাকা পাওয়া যায়। এটি সমাজকে দুর্নীতির অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়।
আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা
ঘুষ সমাজকে ধ্বংস করে এবং মানুষের নৈতিকতা নষ্ট করে। তাই আল্লাহর কাছে দোয়া করা প্রয়োজন যাতে তিনি আমাদের ঘুষখোরদের হাত থেকে রক্ষা করেন এবং হাদিয়ার নামে ঘুষ দেওয়া থেকেও বিরত রাখেন।