ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি পর্যায়কে সুনির্দিষ্ট নীতি ও আদর্শ দিয়ে সুসংগঠিত করেছে। ইবাদত, আচার-ব্যবহার, নৈতিকতা, পরিবারব্যবস্থা—কোনো ক্ষেত্রই ইসলামের দৃষ্টির বাইরে নয়। এরই ধারাবাহিকতায় পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ, অনুগত্য ও শ্রদ্ধা ইসলামের এমন একটি বিধান যা আল্লাহর ইবাদতের পরেই স্থান পেয়েছে।
আল্লাহর ইবাদত ও পিতা-মাতার সেবা—সমস্ত আদেশের কেন্দ্রবিন্দু
সূরা বনী ইসরাঈল (১৭:২৩-২৫)-এ আল্লাহ বলেন—তাঁর ইবাদত ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে এবং পিতা-মাতার প্রতি সর্বোচ্চ সদাচরণ করতে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া পিতা-মাতার সামনে ‘উফ’ শব্দটুকু বলাও নিষেধ করা হয়েছে। এখানেই প্রতিফলিত হয় পিতা-মাতার মর্যাদা কতটা উচ্চ।
আল্লাহর ইবাদতের সাথে পিতা-মাতার সেবাকে পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে এ কারণে যে, সৃষ্টিকর্তা হিসাবে আল্লাহ অনন্য; আর জন্মদাতা হিসেবে পিতা-মাতা অনন্য। এ সম্পর্ক তুলনাহীন, অতুলনীয়—অতএব তাদের হকও সর্বোচ্চ মর্যাদার।
আরও পড়ুন >> নামাজে খুশু-খুজুর গুরুত্ব ও অর্জনের উপায়
আদেশের চূড়ান্ততা ও অপরিবর্তনীয়তা
“ওয়াক্বাদ্বা রব্বুকা”—‘তোমার প্রতিপালক চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন’। এই শব্দচয়ন প্রমাণ করে যে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক কঠোর ও স্থায়ী নির্দেশ। যেমন আল্লাহর ইবাদত অপরিহার্য, ঠিক তেমনি পিতা-মাতার হকও অপরিবর্তনীয়।
শরিয়তবিরোধী আদেশ ছাড়া—পিতা-মাতার আনুগত্য
ইসলাম পিতা-মাতাকে সম্মান ও অনুগত্যের অধিকার দিয়েছে। তবে যদি তারা সন্তানকে শিরক, কুফরি বা কুরআন–হাদীস বিরোধী কাজে বাধ্য করে—সে ক্ষেত্রে সন্তানের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের আদেশ না মানা। তবে নিষেধ মানলেও সৌজন্য, ভদ্রতাবোধ, আচরণ—এসব ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা করা যাবে না।
এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পেছনে সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রাঃ)-এর ঘটনা সুপরিচিত, যেখানে তার মা ইসলাম ত্যাগ করানোর জন্য অনাহারে থাকার শপথ করেছিলেন। কিন্তু তিনি দ্বীনের ব্যাপারে আপসহীন থাকেন। শেষে আয়াত নাযিল হয়—শিরকের আদেশ মানা যাবে না, তবে পিতা-মাতার সাথে দুনিয়াবি আচরণ উত্তম হতে হবে।
অমুসলিম পিতা-মাতার সঙ্গেও উত্তম আচরণ
ইসলাম শুধু মুসলিম পিতা-মাতা নয়; অমুসলিম পিতা-মাতার প্রতিও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে। আসমা (রাঃ)-এর কাছে তার মুশরিক মা আসলে নবী ﷺ তাকে সদাচরণ করতে বলেন। আবু হুরায়রার মা ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও ইসলামের মহত্ত্বের সুন্দর উদাহরণ।
মাতৃত্বের কঠিন ত্যাগ — সন্তানের কৃতজ্ঞতার ভিত্তি
আল্লাহ কুরআনে বারবার স্মরণ করান—গর্ভধারণ থেকে প্রসব এবং দু’বছর দুধ পান করানো পর্যন্ত একজন মা যেসব কষ্ট সহ্য করেন তা অপরিমেয়। তাই সন্তানের কর্তব্য হচ্ছে পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা, তাদের সেবা করা এবং সর্বোচ্চ সম্মানে রাখা।
পিতা-মাতার পায়ের নিচে জান্নাত
নবী ﷺ বলেছেন, “জান্নাত রয়েছে মায়ের পায়ের নিচে।”
অন্যদিকে তিনি বলেছেন, যাদের পিতা-মাতা বৃদ্ধ অবস্থায় জীবিত থাকেন অথচ তারা তাদের সেবা করে জান্নাত অর্জন করতে পারে না—তাদের জন্য দু:খ ও আফসোস।
জিহাদে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে নবী ﷺ অনেককে পিতা-মাতার সেবা করতে বলেছেন; তা-ই তাদের জন্য উত্তম ও সর্বোচ্চ আমল বলে বিবেচিত হয়েছে।
মায়ের অধিকার তিনগুণ, তারপর পিতা
এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলে নবী ﷺ তিনবার ‘মা’ এবং তারপর ‘পিতা’-র নাম বলেন। এর অর্থ, মায়ের ত্যাগ, শ্রম ও ভূমিকা বেশি—অতএব তার হকও সর্বাধিক।
পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি
হাদিসে বলা হয়েছে:
“পিতার সন্তুষ্টিতে রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর তার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।”
এটি প্রমাণ করে পিতা-মাতার সুখ-শান্তি, ইজ্জত ও খেদমত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম সহজ পথ।
দোয়া—পিতা-মাতার বড় অস্ত্র
রাসূল ﷺ বলেন—তিন ব্যক্তির দোয়া অবশ্যই কবুল হয়, তাদের মধ্যে এক জন হলো পিতা-মাতা। সন্তানের জন্য তাদের দোয়া কল্যাণের, আর অভিশাপ বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা শুধু নৈতিক বা সামাজিক দায়িত্ব নয়—এটি ঈমানের অংশ, ইবাদতের শামিল। তাদের সম্মান, সেবা, অনুগত্য, দোয়া প্রার্থনা—এসব শুধু দুনিয়ার কল্যাণ নয়, বরং আখেরাতের মুক্তির দ্বার।
যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি পিতা-মাতার সেবা ও সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে, সে নিঃসন্দেহে জান্নাতের সহজতম পথটি বেছে নেয়।