হিসবা ইসলামে কী: আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকারের পূর্ণ ব্যাখ্যা

হিসবা বা আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব। তবে কাকে, কখন এবং কীভাবে অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে—তা জানার আগে হিসবার মূল উদ্দেশ্য বোঝা জরুরি। ইমাম গাযালী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইহইয়া উলুমুদ্দিন-এ হিসবার প্রকৃত লক্ষ্যকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।


হিসবার মূল উদ্দেশ্য কী

ইমাম গাযালীর মতে, হিসবা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা এবং তাকে গুনাহের পরিণতি থেকে রক্ষা করা। এখান থেকে হিসবার দুটি প্রধান উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়।

প্রথমত, আল্লাহর অধিকার সংরক্ষণ করা। অর্থাৎ এমন সব কাজ প্রতিরোধ করা, যা আল্লাহর বন্দেগির পরিপন্থী বা তাঁর নির্ধারিত সার্বজনীন নৈতিক মূল্যবোধ নষ্ট করে।
দ্বিতীয়ত, সৃষ্টির অধিকার রক্ষা করা। অর্থাৎ মানুষের জান, মাল, সম্মান বা অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন কাজ থামানো।

এই দুটি উদ্দেশ্যের যেকোনো একটি উপস্থিত হলেই হিসবা করা আবশ্যক হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন >> সঠিক জীবনসঙ্গী নির্বাচন: সুখী দাম্পত্য জীবনের ইসলামিক নির্দেশনা


কারা হিসবার আওতায় পড়ে

হিসবার ক্ষেত্রে যাদের বিরুদ্ধে আদেশ বা নিষেধ প্রযোজ্য হয়, তাদের কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।

প্রথমত, প্রাপ্তবয়স্ক ও শরিয়তের দায়ভারপ্রাপ্ত নারী ও পুরুষ। এই দলে নিজের অধীনস্থ ব্যক্তি যেমন স্ত্রী-সন্তান যেমন আছে, তেমনি পিতা-মাতা, শিক্ষক এমনকি শাসকও অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। তবে সম্পর্কভেদে পদ্ধতির পার্থক্য থাকবে।

দ্বিতীয়ত, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু। তারা শরিয়তের দায়ভারপ্রাপ্ত না হলেও প্রকাশ্যভাবে ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত হলে তা থামানো জরুরি।

তৃতীয়ত, শরিয়তের দায়ভারপ্রাপ্ত নয় এমন ব্যক্তি, যেমন মানসিকভাবে অসুস্থ, পাগল বা ঘুমন্ত কেউ। ইমাম গাযালী ব্যাখ্যা করেন, এসব ক্ষেত্রে নিষেধের উদ্দেশ্য গুনাহ গণনা নয়; বরং সার্বজনীন নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা।

তিনি আরও বলেন, এমনকি পশু যদি কারও সম্পদ নষ্ট করে, তাকেও থামানো হবে। এখানে পশুর দায় নয়; বরং মানুষের অধিকার রক্ষা করাই মূল বিষয়।


মন্দ কাজ নিষেধ করার পদ্ধতি

রাসুলুল্লাহ ﷺ একটি সুপরিচিত হাদিসে মন্দ কাজ প্রতিরোধের তিনটি স্তর উল্লেখ করেছেন—ক্ষমতা অনুযায়ী কাজের মাধ্যমে, ভাষার মাধ্যমে এবং অন্তরের ঘৃণার মাধ্যমে। ইমাম গাযালী এই নীতিকে আরও বিস্তারিত করে দশটি ধাপে ব্যাখ্যা করেছেন।

প্রথম ধাপ হলো, মন্দ কাজ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং অন্তরে তা ঘৃণা করা।
দ্বিতীয় ধাপে, সুন্দর ও সহানুভূতিশীল ভাষায় কাজটির ক্ষতিকর দিক বোঝানো।
তৃতীয় ধাপে, কিছুটা দৃঢ়ভাবে নিষেধ করা।
চতুর্থ ধাপে, কঠোর সতর্কতা ও উপদেশ দেওয়া।
পঞ্চম ধাপে, তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করা।
ষষ্ঠ ধাপে, শারীরিকভাবে বাধা দেওয়া।
সপ্তম ধাপে, প্রহারের হুমকি দেওয়া।
অষ্টম ধাপে, সম্পর্ক ও কর্তৃত্বের সীমার মধ্যে থেকে বাস্তবে প্রহার করা।
নবম ধাপে, শাসকের অনুমতিতে শক্তি প্রয়োগ।
দশম ও শেষ ধাপে, রাষ্ট্রীয় শক্তি বা বাহিনী ব্যবহার।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, যত উপরের ধাপে যাওয়া হয়, তত কম সংখ্যক মানুষের ওপর সেই দায়িত্ব বর্তায়। সব স্তর সবার জন্য নয়।


কোন বিষয়ে আদেশ বা নিষেধ করা যাবে

হিসবার ক্ষেত্রে আবেগের বশে কাজ করা যাবে না। ইমাম গাযালী এ বিষয়ে কিছু সুস্পষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করেছেন।

প্রথমত, কাজটি স্পষ্টভাবে শরিয়তের দৃষ্টিতে মন্দ হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কাজটি তখন ঘটতে থাকতে হবে। অতীত বা কেবল সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কাজের জন্য বলপ্রয়োগ করা যাবে না।
তৃতীয়ত, কাজটি প্রকাশ্যে সংঘটিত হতে হবে। ব্যক্তিগত বা গোপন বিষয়ে গুপ্তচরবৃত্তি নিষিদ্ধ।
চতুর্থত, কাজটি নিয়ে ইসলামী আলেমদের মধ্যে ঐকমত্য থাকতে হবে। মতভেদপূর্ণ বিষয়ে হিসবা করা যাবে না।


ন্যায়সঙ্গত হিসবার চারটি মানদণ্ড

সঠিক হিসবা নিশ্চিত করতে চারটি বিষয়ের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
ভুলভাবে কাউকে অপরাধী না বানানো,
মাজহাবভিত্তিক মতবিরোধ এড়িয়ে চলা,
ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করা,
এবং অজ্ঞতা বা মতভেদের কারণে অপ্রয়োজনীয় শাস্তি না দেওয়া।

এই নীতিগুলো মেনে চললে হিসবা সমাজে ফিতনা নয়; বরং ন্যায়, শৃঙ্খলা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top