গীবত মানুষের জন্য একটি মারাত্মক ব্যাধির মতো। ক্যান্সার মানুষের শরীর ধ্বংস করে, আর গীবত ধ্বংস করে আমাদের নেকী ও কর্মফল। দুনিয়াতে এটি আমাদের মর্যাদা নষ্ট করে এবং পরকালে সর্বস্বান্ত করে। দৈনন্দিন জীবনে গীবত ও পরনিন্দা থেকে মুক্ত থাকার পথ খুঁজে বের করা জরুরি। এখানে কিছু কার্যকর উপায় তুলে ধরা হলো।
১. গীবতের ভয়াবহতা বোঝা
গীবত থেকে রক্ষা পেতে প্রথমে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানাটা জরুরি। অনেকেই জানে না যে গীবত সাধারণ পাপ নয়। এটি অন্য কোন গুনাহের চেয়ে মারাত্মক। গীবতের মাধ্যমে যদি কারো নেকী ক্ষয় হয়, তবে সেই নেকীকে গীবতকারীর ওপর স্থানান্তর করা হয়। আর যদি নেকী না থাকে, তবে তার উপর গীবতের পাপ চাপানো হয়। সুতরাং গীবত সম্পর্কে সচেতন হলে তা এড়িয়ে চলা সহজ হয়।
২. জিহবা সংযত রাখা
গীবতের মূল কেন্দ্র হল জিহবা। কথার মাধ্যমে গীবত সহজে ঘটে। তাই কথা বলার আগে চিন্তা করা জরুরি। নিজের উচ্চারিত শব্দ গীবত হচ্ছে কি-না তা খেয়াল রাখতে হবে। অন্তরের ভাবনাই মুখে বের হয়। অন্তর পরিচ্ছন্ন হলে জিহবা নিয়ন্ত্রণও সহজ হয়।
আরও পড়ুন >> ইসলামী জীবনযাপনের জন্য ফরজে আইন ও ফরজে কিফায়া বিদ্যার গুরুত্ব
৩. প্রয়োজনীয় কথা বলা বা চুপ থাকা
গীবতের অনেকটাই কথা-বার্তা থেকেই ঘটে। তাই অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। যা বলার প্রয়োজন, তা সঠিক ও কল্যাণকর হওয়া উচিত। অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে গেলে পাপ থেকে মুক্ত থাকা যায়।
৪. আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত থাকা
জিহবা আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত থাকলে গীবত থেকে রক্ষা পায়। আল্লাহর যিকর করা আমাদের কথা ও কাজে কল্যাণ আনে। যখন জিহবা আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত থাকে, তখন তা হারাম বা অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হয় না।
৫. গীবতের ক্ষতি মনে রাখা
গীবত করার আগে মনে রাখতে হবে যে, আপনি যে নেকী অর্জন করেছেন তা ক্ষয় হতে পারে। ক্বিয়ামতের দিন গীবতকৃত ব্যক্তির পাপ বা তার নেকী আপনার উপর চলে আসে। এটি স্মরণ করলে মানুষ বারবার গীবত করা থেকে বিরত থাকে।
৬. গীবতকারীর মজলিস এড়িয়ে চলা
পরিবেশ ও সঙ্গও গীবতের জন্য দায়ী। গীবত শোনাও সমান পাপ। তাই নিন্দুক ও গীবতকারীর সঙ্গ এড়িয়ে চলা উচিত। যদি কেউ অনিচ্ছা সত্ত্বেও গীবত করে, তবে সেখান থেকে উঠে যাওয়াই উত্তম।
৭. মানুষের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করা
অপরের ভুল খুঁজে দেখার চেয়ে নিজের ভুল সংশোধন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সালাফগণ এই নীতি মেনে চলতেন। তারা অন্যের ত্রুটি উপেক্ষা করে নীরব থাকতেন। এই অভ্যাস গীবত পরিহারে সাহায্য করে।
৮. নিজের ভুল-ত্রুটির প্রতি মনোযোগ দেওয়া
মানুষের ভুল-ত্রুটি স্বাভাবিক। নিজের ত্রুটি বোঝা ও সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত। অন্যের ত্রুটি বেশি খুঁজলে গীবতের অভ্যাস জন্মায়। নিজের ত্রুটি বোঝা মানুষের আত্মপরিশোধের পথ।
৯. আল্লাহর কাছে দো‘আ করা
জিহবা ও গীবত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া তা সম্ভব নয়। তাই দৈনন্দিন দো‘আ ও তাওফীক্ব কামনা করা প্রয়োজন। আল্লাহর সহযোগিতা ছাড়া আমরা আমাদের জিহবা থেকে গীবত আটকাতে পারি না।
১০. সালাফদের সতর্কতা অনুসরণ
সালাফগণ গীবত থেকে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। তারা নিজেরা কখনও গীবত করতেন না, কাউকে তা করতে দেখলে বাধা দিতেন বা সেখান থেকে চলে যেতেন। এই সতর্কতা অনুসরণ করলে গীবত থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
উপসংহার:
যেমন ছিদ্রযুক্ত বালতি পূর্ণ হতে পারে না, তেমনই গীবতের মাধ্যমে নেকী ধ্বংস হয়। জিহবা সংযত রাখা, আল্লাহর যিকরে ব্যস্ত থাকা, অপরের ভুল উপেক্ষা করা এবং সালাফদের সতর্কতা মেনে চলা গীবত থেকে মুক্ত থাকার কার্যকর উপায়। মহান আল্লাহ আমাদের গীবত ও সকল পাপ থেকে রক্ষা করুন এবং পরিশুদ্ধ জীবন যাপনের তাওফীক দান করুন।