মানুষ অসুস্থ হলে অনেক সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কেউ কেউ হতাশ হয়ে পড়ে, আবার কেউ তাকদীরকে দোষ দেয়। কিন্তু একজন মুমিনের পথ ভিন্ন। অসুস্থতা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এই সময় ধৈর্য, সঠিক আকীদা ও আল্লাহর উপর ভরসাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
১. রোগ সম্পর্কে বিশুদ্ধ আকীদা রাখা
রোগ দেওয়া ও সুস্থতা দান করা একমাত্র আল্লাহর হাতে। কোন ডাক্তার বা ঔষধ নিজ ক্ষমতায় রোগ সারাতে পারে না। তারা কেবল মাধ্যম। তাই রোগের জন্য কাউকে দোষারোপ করা উচিত নয়। সংক্রামক রোগও আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ছড়াতে পারে না। তবে সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। সুন্নাহতে অসুস্থ ব্যক্তিকে আলাদা রাখার নির্দেশ এসেছে। সুতরাং ঈমান অটুট রেখে প্রয়োজনীয় সাবধানতা গ্রহণ করা জরুরি।
২. রোগকে তাকদীরের অংশ মনে করা
জীবনের সুখ-দুঃখ সবই তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত। অসুস্থতাও তার বাইরে নয়। যা ঘটেছে, তা আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। তাই “যদি এমন করতাম” ধরনের আফসোস শয়তানের কুমন্ত্রণা। এই চিন্তা ঈমান দুর্বল করে। বরং দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে, যা হয়েছে তা আল্লাহর হিকমতেই হয়েছে। এই বিশ্বাস অন্তরে প্রশান্তি আনে।
৩. ধৈর্য ধারণ ও সওয়াবের আশা
রোগের কষ্টে ধৈর্য ধরা বড় ইবাদত। কুরআনে ধৈর্যশীলদের জন্য অগণিত প্রতিদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অসুস্থতা পাপ মোচনের কারণও হতে পারে। তাই অভিযোগ না করে ধৈর্য ও সওয়াবের আশা রাখা উচিত। ধৈর্য মানে কষ্ট লুকানো নয়, বরং অসন্তোষ প্রকাশ না করা।
৪. রোগকে গালি না দেওয়া
অনেকে জ্বর বা ব্যথাকে গালি দেয়। এটি ঠিক নয়। রোগকে অমঙ্গল ভাবা ঈমানের পরিপন্থী। অসুস্থতায় আল্লাহর দিকে ফিরে দোয়া করা উচিত। নবীদের জীবনেও কঠিন অসুস্থতা এসেছে। তারা অভিযোগ করেননি, বরং বিনয়ের সাথে সাহায্য চেয়েছেন। তাই হতাশা নয়, প্রার্থনাই হওয়া উচিত আমাদের আশ্রয়।
৫. মৃত্যু কামনা না করা
কষ্টে পড়ে মৃত্যু কামনা করা ঠিক নয়। জীবন যতদিন আছে, ততদিন ভাল কাজের সুযোগ রয়েছে। অসুস্থতা সাময়িক হতে পারে। তাই জীবনকে আল্লাহর আমানত মনে করে ধৈর্য ধরতে হবে। প্রয়োজনে এভাবে দোয়া করা যায়—হে আল্লাহ, জীবন যদি কল্যাণকর হয় তবে আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন, আর মৃত্যু যদি উত্তম হয় তবে তা দান করুন।
৬. হতাশ ও আতঙ্কিত না হওয়া
রোগ মানেই শেষ নয়। অনেক গুরুতর রোগ থেকেও মানুষ সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছে। আবার অনেক সুস্থ মানুষ হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছে। তাই অতিরিক্ত ভয় ও আতঙ্ক পরিহার করা উচিত। হতাশা শয়তানকে আনন্দ দেয় এবং আত্মাকে দুর্বল করে। ধৈর্য ও ভরসা অন্তরে শক্তি জোগায়।
৭. বেশি বেশি দোয়া করা
আরোগ্যের জন্য দোয়া সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সুস্থতা প্রার্থনা করা উচিত। সকাল-সন্ধ্যার দোয়া নিয়মিত পড়া উপকারী। নিজের ব্যথার জায়গায় হাত রেখে দোয়া করা সুন্নাহসম্মত আমল। মনে রাখতে হবে, প্রকৃত আরোগ্য একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
৮. দান-সদকা করা
দান-সদকা রোগ মুক্তির একটি উপায়। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। নিজের বা প্রিয়জনের সুস্থতার নিয়তে দান করলে উপকার পাওয়া যায়। দান মানুষের বিপদ দূর করে এবং আখিরাতে প্রতিদান বাড়ায়।
আরও পড়ুন >> নেতৃত্বের লোভ: ইসলামের দৃষ্টিতে ক্ষমতা, আমানত ও জবাবদিহিতা
৯. চিকিৎসা গ্রহণ করা
চিকিৎসা নেওয়া তাওয়াক্কুলের বিরোধী নয়। বরং এটি সুন্নাহসম্মত। প্রতিটি রোগের চিকিৎসা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। মানুষ গবেষণার মাধ্যমে তা আবিষ্কার করে। তাই অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে বিশ্বাস রাখতে হবে, সুস্থতা আল্লাহর ইচ্ছাতেই আসে।
১০. হারাম পদ্ধতি পরিহার করা
অপবিত্র বা হারাম জিনিস দিয়ে চিকিৎসা করা বৈধ নয়। জ্যোতিষী বা গণকের কাছে যাওয়া ঈমানের জন্য ক্ষতিকর। তাবিজ-কবচের উপর নির্ভর করা উচিত নয়। কুরআন ও সহিহ দোয়ার মাধ্যমেই ঝাড়ফুঁক করা উচিত।
সুস্থ ব্যক্তির দায়িত্ব
১. রোগীকে দেখতে যাওয়া
রোগীকে দেখতে যাওয়া বড় নেক আমল। এতে রোগীর মন ভালো হয়। এটি মুসলিমের অধিকারও বটে। এমনকি অমুসলিম অসুস্থ ব্যক্তিকেও দেখতে যাওয়া মানবিক দায়িত্ব।
২. রোগীর জন্য দোয়া করা
রোগীর পাশে বসে সুস্থতার দোয়া করা উচিত। তাকে আশা দেওয়া উচিত। ইতিবাচক কথা রোগীর মনোবল বাড়ায়।
৩. অসহায় রোগীদের সাহায্য করা
গরিব ও অসহায় রোগীদের আর্থিক ও মানসিক সহায়তা করা বড় ইবাদত। চিকিৎসা, খাবার ও ওষুধের ব্যবস্থা করা সামাজিক দায়িত্ব।
৪. চিকিৎসা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া
সঠিক ডাক্তার ও হাসপাতালের পরামর্শ দেওয়া উচিত। কোন খাবার উপকারী আর কোনটি ক্ষতিকর তা জানানোও সহায়ক ভূমিকা।
অসুস্থতা মানুষের জন্য পরীক্ষা, কিন্তু একই সাথে রহমতও হতে পারে। রোগীর উচিত ধৈর্য, দোয়া ও সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করা। সুস্থ ব্যক্তির উচিত সহমর্মিতা ও সহযোগিতা করা। কুরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা মেনে চললে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন সম্ভব, ইনশাআল্লাহ।