মানুষ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীর ঘরে অতিথি হয়ে যায়। আতিথেয়তা সামাজিক সম্পর্ককে গভীর করে। ইসলাম আতিথেয়তার জন্য সুস্পষ্ট আদব নির্ধারণ করেছে। এসব আদব মানলে ভ্রাতৃত্ব মজবুত হয় এবং নেকী অর্জন করা যায়। নিচে আপ্যায়নকারী ও অতিথির করণীয় সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
আপ্যায়নকারীর জন্য আদব
১. আল্লাহভীরু মানুষকে দাওয়াত দেওয়া
দাওয়াতের ক্ষেত্রে সৎ ও পরহেজগার মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তম। সৎ মানুষের সাহচর্য চরিত্র গঠনে সহায়তা করে। তবে ক্ষুধার্ত যে-ই হোক, তাকে খাদ্য দেওয়া মানবিক দায়িত্ব। নিয়ত হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ।
২. ধনী-দরিদ্র ভেদাভেদ না করা
শুধু ধনীদের দাওয়াত দিয়ে গরিবদের বাদ দেওয়া উচিত নয়। এতে সমাজে বিভাজন তৈরি হয়। দাওয়াত এমন হওয়া চাই, যেখানে আন্তরিকতা থাকবে; প্রদর্শন নয়।
৩. গর্ব বা অহংকারের উদ্দেশ্য না রাখা
খাদ্য খাওয়ানো একটি ইবাদত। তাই দাওয়াত যেন লোক দেখানো না হয়। উদ্দেশ্য হবে নেকী অর্জন ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করা। অহংকার কাজকে মূল্যহীন করে দেয়।
৪. অতিথিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা
অতিথি এলে হাসিমুখে স্বাগত জানানো সুন্নাতসম্মত আচরণ। সুন্দর সম্ভাষণ অতিথির মন জয় করে। প্রথম সাক্ষাৎই সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে।
৫. অতিথিকে সম্মান করা
অতিথির সম্মান ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো ব্যবহার ও যত্ন নেওয়া উচিত। ছোট উপহার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও আন্তরিক আচরণ সম্মানের অংশ।
৬. দ্রুত ও সুশৃঙ্খল আপ্যায়ন
অতিথি এলে অযথা দেরি না করে খাবার পরিবেশন করা ভালো। প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন পানি, বিশ্রামের স্থান বা টয়লেট দেখিয়ে দেওয়া শালীনতা। এতে অতিথি স্বস্তি অনুভব করে।
আরও পড়ুন >> রোগীর করণীয় ও সুস্থ ব্যক্তির দায়িত্ব | ইসলামিক দিকনির্দেশনা
৭. নিজে সেবা করার চেষ্টা
সম্ভব হলে আপ্যায়নের কাজে নিজে অংশ নেওয়া উত্তম। এতে ভালোবাসা প্রকাশ পায়। পরিবারকেও এতে সম্পৃক্ত করা যায়।
৮. কৃত্রিমতা ও অপচয় পরিহার
সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় করা ঠিক নয়। ঋণ নিয়ে দাওয়াত দেওয়া বা অতিরিক্ত আয়োজন করা অনুচিত। সরলতা ও স্বাভাবিকতা আতিথেয়তার সৌন্দর্য বাড়ায়।
৯. অতিথিকে প্রাধান্য দেওয়া
নিজের প্রয়োজনের আগে অতিথির প্রয়োজন দেখা মহৎ গুণ। সামান্য খাবার থাকলেও তা ভাগ করে নেওয়া প্রশংসনীয়।
১০. ডান দিক থেকে পরিবেশন
খাবার পরিবেশনের সময় ডান দিক থেকে শুরু করা সুন্নাতের অনুসরণ। এতে শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
১১. রাগ বা বিরক্তি প্রকাশ না করা
অতিথির সামনে রাগ দেখানো বা অসহিষ্ণু আচরণ অনুচিত। হাসিমুখে কথা বলা উচিত। বিরক্তি প্রকাশ করলে সম্পর্ক নষ্ট হয়।
১২. অপ্রয়োজনীয় কষ্ট না দেওয়া
জোর করে বেশি খাওয়ানো বা বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটানো ঠিক নয়। অতিথির স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।
১৩. বিদায়কালে এগিয়ে দেওয়া
অতিথি চলে গেলে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়া ভদ্রতা। এতে আন্তরিকতা প্রকাশ পায়।
অতিথির জন্য আদব
১. দাওয়াত গ্রহণ করা
কেউ আন্তরিকভাবে দাওয়াত দিলে তা গ্রহণ করা উচিত। অকারণে প্রত্যাখ্যান করলে মন কষ্ট পেতে পারে।
২. ধনী-দরিদ্র পার্থক্য না করা
গরিবের দাওয়াত উপেক্ষা করা উচিত নয়। এতে ভ্রাতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩. রোজা থাকলেও উপস্থিত হওয়া
রোজা থাকলে দাওয়াতে অংশ নিয়ে দোয়া করা যায়। এতে সম্পর্ক অটুট থাকে।
৪. সময়মতো উপস্থিতি
অতিরিক্ত দেরি বা খুব আগে পৌঁছানো সমীচীন নয়। সময়জ্ঞান শালীনতার অংশ।
৫. অনুমতি নিয়ে প্রবেশ ও প্রস্থান
বাড়িতে ঢোকার আগে সালাম দিয়ে অনুমতি নেওয়া উচিত। খাওয়ার পর অযথা দীর্ঘ সময় না থাকা উত্তম।
৬. তিন দিনের বেশি না থাকা
অতিথি হিসেবে দীর্ঘদিন অবস্থান করলে মেজবানের কষ্ট হতে পারে। প্রয়োজন ছাড়া তিন দিনের বেশি থাকা ঠিক নয়।
৭. অতিরিক্ত লোক সঙ্গে না আনা
দাওয়াত না পাওয়া কাউকে সঙ্গে আনলে আগে অনুমতি নেওয়া উচিত।
৮. খুশি মনে ফিরে আসা
খাবার শেষে দোয়া করে বিদায় নেওয়া ভালো। অযথা গল্পে সময় নষ্ট করা উচিত নয়।
৯. মেজবানের জন্য দোয়া
খাবারের পর মেজবানের রিজিক, মাগফিরাত ও বরকতের জন্য দোয়া করা সুন্নাতসম্মত আচরণ।
১০. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
মেজবানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো জরুরি। যে মানুষের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না, সে প্রকৃত অর্থে কৃতজ্ঞ হতে পারে না।
আতিথেয়তার আদব ইসলামী সমাজব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আপ্যায়নকারী ও অতিথি উভয়েই দায়িত্বশীল আচরণ করলে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। সরলতা, আন্তরিকতা ও কৃতজ্ঞতা এই আদবের মূল ভিত্তি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এসব আদব মেনে চলার তাওফিক দান করুন।