সমাজে ধনী–গরিব, মালিক–শ্রমিক, অসহায়–সক্ষম—সব ধরনের মানুষের বসবাস। এটি আল্লাহর হিকমত ও ব্যবস্থাপনা। যদি সমাজে সবাই ধনী হয়ে যেত, তবে শ্রমিকের প্রয়োজন কে পূরণ করত? আবার সবাই যদি শ্রমিক হতো, কাজের সুযোগই বা কোথায় মিলত? তাই সমাজকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে রাখা হয়েছে। তবে ধনীরা গরিবদের শোষণ করবে—এমন অনুমতি ইসলাম দেয় না। বরং অন্যায় দখল, যুলুম ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে অসহায় শ্রেণি : ইয়াতীম সন্তান
ইয়াতীম সন্তান সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। শৈশবেই পিতা বা উভয় পিতামাতাকে হারিয়ে তারা অসহায় হয়ে পড়ে। শিক্ষা, লালন-পালন ও নিরাপদ জীবন—সবই অনিশ্চিত হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সম্পদ অন্যরা আত্মসাৎ করে। অথচ ইসলামে ইয়াতীমের সম্পদ ও অধিকার রক্ষার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন >> ক্ষুধার্তকে খাদ্য দানের গুরুত্ব, ফযীলত ও শাস্তি — ইসলামিক দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ আলোচনা
ইয়াতীম শব্দের অর্থ
আরবি ‘ইয়াতীম’ শব্দের অর্থ একাকী বা নিঃসঙ্গ। শরীয়তের পরিভাষায় যে শিশু বালেগ হওয়ার আগে পিতাকে হারায়—সেই ইয়াতীম। ছেলে-মেয়ে উভয়ই এ শর্তের অন্তর্ভুক্ত। মা মারা গেলে সন্তান ইয়াতীম বলা হয় না; তবে পিতা-মাতা উভয়ই মারা গেলে সে চরম অসহায় হয়ে ওঠে।
ইয়াতীমের বয়সসীমা
ইয়াতীমের অবস্থা বালেগ হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “যৌবনপ্রাপ্ত হলে আর ইয়াতীম থাকে না।” তাই বালেগ হওয়ার পর তার সম্পদ তাকে ফিরিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক।
ইয়াতীম প্রতিপালনের গুরুত্ব
ইসলামে ইয়াতীমের অধিকার অত্যন্ত সুস্পষ্ট। আল্লাহ তাঁর ইবাদতের পাশাপাশি ইয়াতীমের প্রতি সদয় হতে বলেছেন। কুরআনের বহু আয়াতে পিতা-মাতা, আত্মীয়, মিসকীনদের সঙ্গে ইয়াতীমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সম্মানহানি ইসলাম ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে।
ইয়াতীমকে সুরক্ষা না দিলে তারা সঠিক শিক্ষা ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হয় এবং সমাজের জন্য বোঝা হয়ে ওঠে। এজন্য ইসলাম পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে তাদের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে।
নবী ﷺ-এর জীবনে ইয়াতীমের মর্যাদা
রাসূল ﷺ নিজেই ছিলেন ইয়াতীম। তাই সকল ইয়াতীমের জন্য তাঁর জীবন সান্ত্বনা। কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমাকে ইয়াতীম অবস্থায় পেয়ে আশ্রয় দিয়েছিলেন।” এ আয়াতের মাধ্যমে ইয়াতীমদের প্রতি সর্বোচ্চ সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইয়াতীম প্রতিপালনের ফজিলত
১. জান্নাতের প্রতিদান
ইয়াতীমকে স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত নিজের সন্তানের মতো পাললে জান্নাত নিশ্চিত হয়। এমনকি ক্ষুধার্ত শিশুকে মাত্র একটি খাবার ভাগ করে দেওয়ার মধ্যেও জান্নাত লাভের সুসংবাদ রয়েছে।
২. জান্নাতে নবী ﷺ -এর প্রতিবেশী হওয়ার সৌভাগ্য
একজন ইয়াতীম প্রতিপালনকারীর সঙ্গে নবী ﷺ জান্নাতে দুটি আঙ্গুলের ন্যায় কাছাকাছি অবস্থানে থাকবেন। এটি উম্মতের জন্য বিরল সৌভাগ্য।
৩. রিযিক ও বরকত বৃদ্ধি
দুর্বলদের সহায়তা করলে আল্লাহ রিযিক বাড়িয়ে দেন। ইয়াতীমদের সাহায্য করাই রিযিক বৃদ্ধির অন্যতম উপায়।
৪. হৃদয় কোমল হয়
ইয়াতীমের প্রতি দয়া দেখালে হৃদয় নরম হয়। কঠোর হৃদয়ের চিকিৎসা হিসেবে রাসূল ﷺ ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলানোর উপদেশ দিয়েছেন।
৫. আত্মীয় ইয়াতীমকে সাহায্য করলে দ্বিগুণ নেকী
আত্মীয় ইয়াতীমকে সাহায্য করলে দানের নেকীর সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক রক্ষার নেকীও পাওয়া যায়।
ইয়াতীমের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ
ইয়াতীমের সম্পদ রক্ষা করা বড় আমানত। এতে অবহেলা করলে কঠোর শাস্তির ভয়াবহতা কুরআন-হাদিসে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। তাই অভিভাবকের দায়িত্ব হচ্ছে সম্পদ সংরক্ষণ করা এবং বালেগ হওয়ার পর সঠিকভাবে ফিরিয়ে দেওয়া।