সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে মানুষ একে অপরের সাথে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। বাড়ির পাশাপাশি বসবাসকারী মানুষই সাধারণভাবে প্রতিবেশী হিসেবে গণ্য। সুখ-দুঃখ, বিপদ-আপদে প্রতিবেশীর সহযোগিতা অমূল্য। ইসলামে প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ।
প্রতিবেশীর সংজ্ঞা ও সীমা
আরবীতে প্রতিবেশীকে বলা হয় جار (জার) এবং ইংরেজিতে Neighbour। পারিভাষিক অর্থ হলো, “তোমার পার্শ্বে বা কাছাকাছি বসবাসকারী ব্যক্তি।”
ইবনুল মানযূরের মতে, প্রতিবেশী হতে পারে মুসলিম বা অমুসলিম, বন্ধু বা শত্রু, উপকারী বা অনিষ্টকারী।
প্রতিবেশীর সীমা নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে:
- হাসান (রাঃ) বলেছেন, চল্লিশ ঘর পূর্ব-পশ্চাৎ ও পাশপাশি থাকা ব্যক্তিরা প্রতিবেশী।
- কেউ বলেন, চারিদিকের দশ ঘর।
- ডাক শুনতে পারা ব্যক্তি।
- অত্যন্ত নিকটে বসবাসকারী।
- একই মসজিদে সমবেত হওয়া ব্যক্তি।
প্রতিবেশীর প্রকারভেদ
দূরত্ব অনুযায়ী:
- নিকটবর্তী প্রতিবেশী
- দূরবর্তী প্রতিবেশী
ধর্ম ও আত্মীয়তার দিক দিয়ে:
- মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী
- মুসলিম অনাত্মীয় প্রতিবেশী
- অমুসলিম প্রতিবেশী
আচার-আচরণের দিক থেকে:
- উত্তম প্রতিবেশী
- নিকৃষ্ট প্রতিবেশী
উত্তম প্রতিবেশী সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, “একজন মুসলমানের জন্য খোলামেলা বাড়ী, সৎপ্রতিবেশী ও রুচিসম্মত বাহন সৌভাগ্য স্বরূপ।”
আরও পড়ুন >> দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সাহায্য
উত্তম আচরণ ও সহানুভূতি
প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করা মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। কোরআন ও হাদীসে বারংবার এ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
- “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করে।”
- প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেওয়া অবশ্যক, কারণ কষ্টদায়ক ব্যক্তি মুমিন হতে পারে না।
প্রতিবেশীর জন্য সদাচরণ ও উপকার
- হাদিয়া প্রদান: নিকটতম প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দিয়ে উপহার দেওয়া।
- ভালো খাবার ভাগ করা: নতুন রান্না করা খাবার বা পশু-পাখির মাংস প্রতিবেশীর সাথে ভাগ করা।
- নিজের পছন্দ প্রতিবেশীর জন্যও প্রযোজ্য করা: নিজের পছন্দ, সুবিধা প্রতিবেশীর জন্যও ইচ্ছাকৃতভাবে করা।
- দাওয়াত গ্রহণ করা: প্রতিবেশীর আহবান মেনে চলা সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক।
অসুস্থ প্রতিবেশী ও দুঃখ-শোকে সমবেদনা
- রোগীকে দেখতে যাওয়া ও সেবা করা একটি মহান নেকী।
- প্রতিবেশীর দুঃখ-শোকে সমবেদনা প্রদর্শন করা।
- জানাযায় অংশগ্রহণ ও পরিবারের জন্য খাদ্য সরবরাহ।
রসূল (ছাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি রোগীকে দেখতে যায়, সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দো‘আ করে এবং তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর প্রস্তুত করা হয়।”
প্রতিবেশীর দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা ও কর্যে হাসানা
- প্রতিবেশীর দোষ-ত্রুটি প্রকাশ না করা।
- কর্যে হাসানা প্রদানের মাধ্যমে সমাজে সহযোগিতা ও দয়া বৃদ্ধি।
- ঋণ মাফ করা, অভাবীকে সাহায্য করা, অসুস্থকে সহায়তা করা।
প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ ইসলামিক নৈতিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সদাচরণ, সাহায্য, সমবেদনা ও ন্যায়পরায়ণতা সমাজে শান্তি এবং সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে। তাই প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের সাথে সহমর্মিতা ও সহযোগিতা প্রদর্শন করা।